Thursday, September 18, 2014

কিছু কুসংস্কারঃ আধুনিক ভাবন!

যুক্তিহীন ভ্রান্ত ধারণা বা গোঁড়ামির অপর নাম কুসংস্কারবাংলার আনাচে কানাচে এখনো প্রচলিত আছে অনেক কুসংস্কার যার কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুগের পর যুগশুধু পশ্চাৎপদ জনতা নয় দেশের সর্বস্তরেই এ কুসংস্কার আসন গেড়ে আছেস্বাস্থ্য বিষয়ক এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা এবং সেগুলোর প্রকৃত কারণ আজকে আমরা আলোচনা করবো

জোড়া ডিম বা কলা খেলে যমজ বাচ্চা হয়ঃ


যমজ বাচ্চা হয় যখন কোন নারীর একই সময় দুটি ডিম্বাণু শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়জোড়া ডিম বা জোড়া কলা প্রকৃতির নিয়মেই হয়ে থাকে, এদের মাঝে এমন কোন উপাদান থাকে না যা যমজ বাচ্চা হতে সাহায্য করবেএকটা সাধারণ কলা বা একটা সাধারণ ডিমে যা থাকে জোড়া কলা বা ডিমে তাই থাকে, শুধু একটার স্থানে দুটো একসাথে থাকেতাই জোড়া ডিম বা কলাতে যমজ বাচা হয় না


আনারস আর দুধ এক সাথে খাওয়া যায় নাঃ
এখন পর্যন্ত আনারস এবং দুধের মাঝে এমন কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যায়নি যার ফলে এদেরকে এক সাথে খেলে সেটা মানুষের জীবনহানি করবেবর্তমানে অনেক খাবারেই দুধ ও আনারস একসাথে মেশানো হয় এবং সারা বিশ্বেই তা খাওয়া হয়কাস্টার্ড নামক ডেজার্টে দুধের সাথে নানারকম ফল মেশানো হয় যার মাঝে আনারসও থাকেকাস্টার্ড খেয়ে বিষক্রিয়ায় কেউ মারা গেছে বলে জানা যায় না

চিনি বা মিষ্টি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়ঃ
যারা ডায়াবেটিস রোগী তারা মিষ্টি বেশি খেলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায় যা কমানো তাদের দেহের পক্ষে সহজসাধ্য হয় না কিন্তু যারা ডায়াবেটিক নন তাদের দেহ রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করে ফেলতে পারে, তাই তারা মিষ্টি বেশি খেলেও কোন সমস্যা নেইশুধুমাত্র যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যক্তিদেরকে ডাক্তাররা মিষ্টি বা চিনি কম করে খেতে বলেন

চিনি খেলে কৃমি হয়ঃ
কৃমি আমাদের দেহে বসবাসকারী পরজীবী যা সাধারণত অন্ত্র বা খাদ্যনালীতেই বাস করেআমাদের শরীর থেকেই খাদ্য সংগ্রহ করে তারা বেঁচে থাকেকৃমি আমাদের দেহে প্রবেশ করে অস্বাস্থ্যকর ভাবে রান্না ও পরিবেশিত খাবার খেলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললেঅপরিষ্কার খাবার, দূষিত পানি, ময়লা হাঁতে খাবার খেলে, খালি পায়ে মাটিতে হাঁটলে, মল ত্যাগের পরে হাত জীবাণুমুক্ত না করলে ইত্যাদি কারণে কৃমি আক্রান্ত করতে পারে আমাদেরকেঅতিরিক্ত চিনি খেলে কৃমির বংশবৃদ্ধির কোন উপকার হয় নাএর সাথে চিনি বেশি খাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই

লবণ ভেজে খেলে প্রেসার বাড়ে নাঃ
আমাদের উচ্চ-রক্তচাপের রোগীদের মাঝে এই ধারণাটি প্রচলিত আছে যে খাবারের সময় পাতে লবণ খেতে হলে তা ভেজে খেতে হবে, তাহলে নাকি রক্তচাপ বাড়বে নাঅতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বৃদ্ধি করেলবণের রাসায়নিক পরিবর্তন না হলে লবণ লবণই থাকবে, সেটা ভেজে বা না ভেজে যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন সেই লবণই থাকবে কারণ লবণের রাসায়নিক পরিবর্তন করার কোন সামর্থ্য এতো অল্প তাপমাত্রায় সম্ভব নাডাক্তাররা উপদেশ হিসেবে বলেন কাঁচা লবণ খাবেন নাকাঁচা লবণ বলতে বোঝানো হয় পাতে লবণ খাওয়াকাঁচা লবণকে ভেজে পাকিয়ে ফেলে আসলে কোন লাভই হবে না

গরমে কৃমির ওষুধ খাওয়া যায় নাঃ
 কৃমিনাশক যেসব ওষুধ বর্তমানে বাজারে চালু আছে সেগুলো সবগুলোই অনেক কার্যকর এবং সহনশীলগরমে কৃমির ওষুধ কাজ করে না অথবা গরমে কৃমির ওষুধ খেলে শরীর খারাপ করবে এটা ভুল ধারণাসব পরিবেশেই আর সব তাপমাত্রায়ই কৃমির ওষুধ কাজ করবে

টক খেলে কাটা সারে নাঃ
কোথাও কেটে গেলে এদেশে অনেকে টক খেতে মানা করেন, বলেন টক খেলে নাকি কাটা সারতে দেরি হয়একথাটি সম্পূর্ণরূপেই ভুলপ্রকৃতপক্ষে টক খেলে কাঁটা আরো দ্রুত সারেসাধারণত টক ফল যেমন লেবু, কামরাঙ্গা, কাঁচা আম ইত্যাদি টক ফলে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সিভিটামিন সি কাটা বা ক্ষতস্থানের আঘাত সারাতে প্রয়োজনীয় কোলাজেন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেতাই কেটে গেলে টক কম না খেয়ে বেশি করে খেতে হবে দ্রুত ক্ষতস্থান পূরণের জন্য

গর্ভকালীন অবস্থা নিয়ে এখনও বেশ কিছু কুসংস্কার রয়েছেযেমনঃ
গর্ভবতী অবস্থায় বেশি খাবার গ্রহণঃ
অনেক মায়ের মধ্যে ধারণা গর্ভবতী অবস্থায় বেশি খাবার গ্রহণ করলে বাচ্চা মায়ের গর্ভে বড় হয়ে যায়এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব হয় না, সিজার করতে হয়মা যতোই খাবার খান না কেন একজন সুস্থ বাচ্চা কখনো খুব বড় হবে না, স্রষ্টার নিয়মেই তার বৃদ্ধি এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে যে সে মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাবে না, যেসব মায়েদের ডায়াবেটিস থাকে বা প্রসবকালীন সময়ে ডায়াবেটিস হয় তাদের বাচ্চার আকার বড় হতে পারে তবে সবসময় নাএ কারণে বেশি খেলে বাচ্চা বড় হবে এটা ভুল ধারণাঅনেকে কম খেয়ে থাকেন বাচ্চা ছোট হবার জন্য যা খুব খারাপ আচরণকম খেলে বাচ্চা বাড়বে নাঅপুষ্ট শিশু জন্ম নেবে এবং প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী নানা সমস্যায় পড়বে মা ও শিশু

নারিকেল গ্রহণ করলে বাচ্চা অন্ধ হয়ঃ
অর্থহীন একটি ধারণা, নারকেল উপাদেয় একটি ফলনারকেল এ এমন কিছু নেই যা মানব চোখকে অন্ধ করে দেয়

হিন্দু মায়েরা এ সময় মাছ-মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকেনঃ
মাছ মাংস না খেলে বাচ্চা বাড়বে না, মা ও পুস্তিহীনতায়  ভুগবেঅসুস্থ মা জন্ম দিবে অসুস্থ এক শিশুতাই এ সময় মা ও বাচ্চার শরীর গঠনে মাছ মাংস খাওয়া দরকার

এধরণের আরো অনেক কুসংস্কার রয়েছে আমাদের সমাজেদায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদেরকে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের এসব ভুল ধারণার মূলোৎপাটন করতে, তবেই আমরা পাবো সুস্থ্য একটি জাতি

[আপনাদের সুখী জীবন আমাদের কাম্যধন্যবাদ।]

0 comments:

Post a Comment